
রাজশাহীর চর মাজারদিয়াড় ইজারার নামে চরম ভোগান্তি ও অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ: চরাঞ্চলবাসীর ক্ষোভ, স্থায়ী বাতিলের দাবি।
শাহাদাত হোসেন
রাজশাহী
রাজশাহীর ‘চর মাজারদিয়াড় (আমিরপুর) খেয়াঘাট’- এর ইজারা স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও কৃষকেরা। ইজারাদারদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত টোল আদায় এবং নানাভাবে হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, এই অন্যায় ইজারা প্রথা দ্রুত বন্ধ করা না হলে তারা আরও কঠোর আন্দোলনে নামবেন।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন, ২০২৬) রাজশাহী মহানগরীর টি-বাঁধ সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীরে চর মাজারদিয়াড় এলাকার সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মানবন্ধনে অংশ নেওয়া চরাঞ্চলের কৃষকেরা জানান, তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং কৃষিনির্ভর। চরে উৎপাদিত মরিচ, টমেটো, ধান, গম, মসুর ডালসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য এবং গবাদিপশু রাজশাহী শহরে এনে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু খেয়া পারাপারের সময় ইজারাদারেরা সরকারি চার্ট বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত টাকা দাবি করে।
ভুক্তভোগী এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বাড়িতে গরু লালন-পালন করে হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে যাই। কিন্তু হাটে নিয়ে যাওয়ার সময় একবার ৩০০ টাকা এবং কোনো কারণে বিক্রি না হলে তা ফেরত নেওয়ার সময় আবারও ৩০০ টাকা আদায় করা হয়। এক বস্তা মরিচ আনলে ১০০ টাকা দিতে হয়। চরের মানুষ বন্যার পানিতে সব হারায়, নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারায়; ৮০ ভাগ মানুষেরই নিজের কোনো জমি নেই। এমতাবস্থায় ইজারার নামে এই বিশাল বোঝা আমরা কীভাবে বইব?” আরেক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, গত বছর এই খেয়াঘাটটি প্রায় ৭০ লক্ষ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার বোঝা মূলত ১০ হাজার চরাঞ্চলবাসীর ওপর এসে পড়েছে। তিনি আরও জানান, এই এলাকাটি কোনো সীমান্ত বা চোরাচালানের পথ নয়, সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদিত পণ্য পারাপার করা হয়। কিন্তু ঘাট পারাপারের সময় সামান্য বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষকে মারধর, হয়রানি এবং প্রতারণার শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি ইজারাদারদের সাথে বিরোধের জেরে অতীতে নদী পারাপারের সময় দুর্ঘটনার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আন্দোলন কারীদের প্রধান সমন্বয়ক ও স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম রেজা মিডিয়া এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “আমরা বাংলাদেশের একদম প্রান্তিক ও রিমোট এলাকায় বাস করি। বিগত ৫০ বছর ধরে আমাদের ওপর এই অবৈধ কর ও চাঁদাবাজি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক, যেখানে সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করে। কিন্তু ইজারাদারদের এই বর্বরতার কাছে আমরা জিম্মি হয়ে পড়েছি। আমরা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই ইজারা প্রথা স্থায়ীভাবে বাতিলের জোর দাবি জানাচ্ছি। যদি অতি দ্রুত এর কোনো সুষ্ঠু সমাধান না আসে, তবে চরের হাজার হাজার মানুষ আবারও রাজপথে নেমে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।” মানববন্ধনে চরাঞ্চলের বিভিন্ন বয়সের শত শত মানুষ প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার হাতে অংশ নেন। ব্যানারগুলোতে “ইজারা বাতিল করতে হবে”, “আর দেবো না চাঁদা” এবং “ভোগান্তির অবসান চাই” সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতি দ্রুত এই খেয়াঘাটের ইজারা সংক্রান্ত জটিলতার স্থায়ী সমাধান করা প্রয়োজন।