
“রসুন চাষে স্বপ্নভঙ্গ: বড়াইগ্রামে উৎপাদনের পাহাড়, বাজারে দামের ধস—দিশেহারা কৃষক”
মোঃ সুজন মাহমুদ ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার খাকসা, দিঘলকান্দি, বাগডোবসহ বিভিন্ন মাঠ ও বিল এলাকা জুড়ে এ মৌসুমে বিস্তীর্ণ জমিতে রসুন চাষ হয়েছে। শীত মৌসুম এলেই এই জনপদের কৃষকেরা রসুন চাষে ঝুঁকে পড়েন। কারণ, একসময় এই রসুনই ছিল বড়াইগ্রামের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু চলতি ইংরেজি ২০২৬ সাল তথা ১৪৩২ অর্থবছরে এসে সেই রসুন চাষই কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্ন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবছর রসুন চাষে উৎপাদন মোটামুটি ভালো হলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, লাভ তো দূরের কথা—অনেকেই পড়ছেন ঋণের বোঝায়।
বাড়ছে উৎপাদন খরচ, কমছে লাভ
এক বিঘা জমিতে রসুন চাষ করতে গিয়ে কৃষকদের যে ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কৃষকেরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ডিএপি সার দিতে হচ্ছে প্রায় ৮০ কেজি, ইউরিয়া সার ৪০ কেজি এবং এমওপি বা পটাশ সার ৪০ কেজি। এর পাশাপাশি রোগবালাই দমনের জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, কীটনাশক ও তরল মেডিসিন।
এছাড়াও সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেচ খরচ। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ধরে রাখতে একাধিকবার সেচ দিতে হচ্ছে। সেচের জন্য ডিজেলচালিত মেশিন ব্যবহার করায় জ্বালানির খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কৃষকদের কণ্ঠে হতাশার গল্প
দিঘলকান্দি গ্রামের কৃষক মোঃ লালচাঁদ আলী বলেন,
“প্রতি বছরই রসুন চাষ করি। কিন্তু এ বছরের মতো লস কখনো দেখি নাই। খরচ যা হয়েছে, তা উঠবে কিনা সেটাই সন্দেহ।”
তার মতো অনেক কৃষকই এবছর রসুন চাষ করে সর্বস্বান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
খাকসা গ্রামের কৃষক মোঃ কাওছার আলম জানান,
“আমরা প্রতি বিঘা জমি বাৎসরিক লিজ নিই প্রায় ৪০ হাজার টাকায়। এরপর বীজ রোপণ থেকে শুরু করে রসুন তোলা পর্যন্ত খরচ পড়ে ২৬ হাজার থেকে ৩১ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এক বিঘায় খরচ দাঁড়ায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে যে দাম, তাতে লাভ তো নাই—উল্টো লস।”
উৎপাদন আছে, কিন্তু বাজার নেই
খাকসা গ্রামের আরেক কৃষক মোঃ আজিম উদ্দিন জানান,
“এই বছর প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ১৮ থেকে ২৪ মন রসুন উৎপাদন হচ্ছে। ফলন খারাপ না। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি প্রতি মন রসুন ৮০০ থেকে ১২০০ টাকার বেশি দাম পাচ্ছি না। এই দামে বিক্রি করে খরচই উঠানো যায় না।”
তিনি আরও বলেন, আগে যেখানে প্রতি মন রসুন ২ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হতো, সেখানে এখন দাম অর্ধেকেরও কম। অথচ সার, বীজ, সেচ—সবকিছুর দাম বেড়েছে।
ঋণের ফাঁদে কৃষক পরিবার
বাগডোব গ্রামের চাষি মোঃ আশরাফুল ইসলাম (হিমেল) ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে বলেন,
“এত কষ্ট করে ফসল ফলিয়ে যদি ন্যায্য দাম না পাই, তাহলে আমরা কীভাবে বাঁচবো? প্রতিবছর রসুন চাষ করতে গিয়ে আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। সংসার চালানোই দায় হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি উপজেলা কৃষি অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,
“আমাদের চাষে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের দাম নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। পাশাপাশি বাজারে যেন কৃষক ন্যায্য দাম পায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।”
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ থেকে ফসল তোলার পরই মধ্যস্বত্বভোগীরা সুযোগ নেয়। কৃষকেরা নগদ টাকার প্রয়োজনে কম দামে রসুন বিক্রি করতে বাধ্য হন। এরপর সেই রসুনই শহরের বাজারে গিয়ে কয়েকগুণ দামে বিক্রি হয়। লাভের ভাগ পায় না প্রকৃত উৎপাদক।
স্থানীয় বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষকের কাছ থেকে প্রতি মন রসুন ৮০০-১২০০ টাকায় কেনা হলেও শহরের বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এই ব্যবধানই কৃষকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করছে।
কৃষি নির্ভর অঞ্চলে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
বড়াইগ্রাম উপজেলা মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। এখানকার হাজারো পরিবার রসুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু রসুন চাষে টানা লোকসান হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, এভাবে লোকসান চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষকই রসুন চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এতে দেশীয় উৎপাদন কমে গিয়ে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে।
কৃষি অফিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পরামর্শ পেলেও বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তারা চান—সরকারি পর্যায়ে রসুন সংরক্ষণ, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা।
সমাধানের পথ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে,
কৃষকের কাছ থেকে সরকারিভাবে রসুন ক্রয়
হিমাগার ও সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি
সার ও কীটনাশকের দাম নিয়ন্ত্রণ
মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা
এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হলে কৃষকেরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে পারেন।
শেষ কথা
মাঠে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা আমাদের খাবারের জোগান দেন, সেই কৃষকরাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। বড়াইগ্রামের রসুন চাষিদের চোখে আজ শুধুই প্রশ্ন—“এইভাবে কি টিকে থাকা যায়?” ন্যায্য মূল্য আর সঠিক নীতিগত সহায়তা ছাড়া তাদের এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন।
কৃষকের কান্না কি নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছাবে? নাকি রসুনের সাদা কোয়ার মতোই কৃষকদের স্বপ্ন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকবে—সময়ই দেবে সেই উত্তর।
প্রতিনিধির আবেগীয় মন্তব্য:
ক্ষেতের পর ক্ষেত সবুজে মোড়া, মাটির নিচে সাদা রসুনের সম্ভাবনা—কিন্তু সেই সম্ভাবনাই আজ বড়াইগ্রামের কৃষকদের কাছে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। একদিকে লাগামহীন উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে ন্যায্য মূল্যের অভাব—সব মিলিয়ে রসুন চাষ এখন লোকসানের ফাঁদ। মাঠে ঘাম ঝরানো কৃষকদের চোখে আজ শুধু অনিশ্চয়তা আর হতাশা।