
ভরা মৌসুমেও পেঁয়াজে ধস—নাটোরে কৃষকের চোখে জল, খরচই উঠছে না
মোঃ সুজন মাহমুদ, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
নাটোরে ভরা মৌসুমেও পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে দাম পড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা আর হতাশা ঘিরে ধরেছে চাষিদের। বিশেষ করে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি এবং সংরক্ষণ সুবিধার অভাবকে দায়ী করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে পেঁয়াজ সাইজভেদে প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করেও সেই তুলনায় কোনো লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠছে না অনেকের।
বড়াইগ্রাম উপজেলার বাগডোব গ্রামের কৃষক মোঃ আশরাফুল ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করে পেঁয়াজ ফলাই, কিন্তু এখন বাজারে এনে যেন নিজের পরিশ্রমকেই বিক্রি করে দিচ্ছি। ৬০০-৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে খরচের অর্ধেকও উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের চাষাবাদই বন্ধ হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে গুরুদাসপুর উপজেলার কৃষক বিমল কুমার জানান, “বর্গা জমি নিতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকায়। বীজ, সার, কীটনাশক—সবকিছুর দাম বেড়েছে। বিঘা প্রতি খরচ ৫০ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু ফলন পেয়েও লাভ নেই, বাজারে দাম নেই। পরিবহন খরচ বাদ দিলে হাতে কিছুই থাকছে না, বরং ঋণের বোঝা বাড়ছে।”
কৃষকদের এই দুরবস্থার বিষয়ে বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজিব আল মারুফ বলেন, “আমরা কৃষকদের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছি। তারা যেন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন, সে জন্য পরামর্শ দিচ্ছি এবং পচন রোধে সহায়ক কিছু উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও সমন্বয় প্রয়োজন।”
এদিকে জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, “চলতি মৌসুমে জেলায় ৭৩০৪ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। তবে মৌসুমের আগে বৃষ্টিপাতের কারণে কিছুটা উৎপাদন কমেছে। তার ওপর আমদানির প্রভাব ও সংরক্ষণ সংকট—সব মিলিয়ে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না।”
সংরক্ষণ সুবিধার অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যান্য জেলায় হিমাগার বা আধুনিক স্টোরেজ থাকলেও নাটোরে তা না থাকায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে মৌসুম শেষে দাম বাড়লেও সেই সুফল পাচ্ছেন না প্রকৃত চাষিরা।
সব মিলিয়ে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারে দরপতন ও সংরক্ষণ সংকট—এই ত্রিমুখী চাপে নাটোরের পেঁয়াজ চাষিরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন।