
বড়াইগ্রামে সেচ প্রকল্প নিয়ে দ্বন্দ্বের অবসান: জামাল উদ্দিন আলীর নেতৃত্বে প্রশংসিত গ্রাম্য সালিশ
মোঃ সুজন মাহমুদ, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ২ নং বড়াইগ্রাম ইউনিয়নের খাকসা-খোকসা এলাকায় একটি সেচ (ডিপ) প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ অবশেষে ২১এ এপ্রিল মঙ্গলবার সন্ধ্যা রাতে খাকসা খোকসা বাজারে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট আইটি স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার পথে এগিয়েছে। চারজন অংশীদারের মধ্যে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাস এক সময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বিষয়টি থানায় অভিযোগ পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এক সুশৃঙ্খল ও গ্রহণযোগ্য সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
জানা যায়, খাকসা-খোকসা এলাকার চারজন ব্যক্তি—মোঃ ঈমান আলী, মোঃ রফিকুল ইসলাম, মোঃ দেলোয়ার হোসেন এবং মোঃ পৈরব আলী—যৌথভাবে একটি সেচ প্রকল্প (ডিপ) পরিচালনা করে আসছিলেন। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। পানি ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং আর্থিক বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, যা পরে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে মোঃ দেলোয়ার হোসেন গ্রাম পর্যায়ে চৌকিদারের মাধ্যমে নোটিশ জারি করে গ্রাম্য সালিশের আহ্বান জানান। অপরদিকে মোঃ ঈমান আলী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ফলে বিষয়টি প্রশাসনিক পর্যায়েও নজরে আসে এবং পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও তাৎক্ষণিক কোনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি।
এই অবস্থায় স্থানীয়ভাবে একটি বৃহৎ সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বড়াইগ্রাম উপজেলা সমবায় সমিতি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য মোঃ জামাল উদ্দিন আলী। তাঁর উপস্থিতি এবং নেতৃত্বে সালিশ বৈঠকটি গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা পায়।
সালিশে উপস্থিত ছিলেন মোঃ নিজাম উদ্দিন মাস্টার, যিনি মিটিং পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি ২ নং বড়াইগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। এছাড়া মোঃ এনামুল হক মুলু সরকার আহ্বায়ক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন ৬ নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ মোঃ করিম হোসাইন, মোঃ সুলতান দৌসানি (যুবদল সাধারণ সম্পাদক ২নং বড়াইগ্রাম ইউনিয়ন), মোঃ মোজাম্মেল হক বাটুল (৬নং ওয়ার্ড যুবদল সভাপতি), মোঃ মহিদুল উদ্দিন মফিজ (স্থানীয় বিএনপি নেতা), প্রধান শিক্ষক মোঃ রেজাউল করিম রেজা, সাবেক ছাত্রনেতা ৬নং ওয়ার্ড মোঃ লিটন পারভেজ, মোঃ মানিক হোসেনসহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সালিশে উভয় পক্ষ তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। দীর্ঘ আলোচনার পর মোঃ জামাল উদ্দিন আলী অত্যন্ত বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে একটি সমাধান প্রস্তাব করেন, যা উপস্থিত সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেন।
তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যদি এই চারজন অংশীদারের মধ্যে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি, ঝামেলা বা বিশৃঙ্খলার কারণে সেচ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন চারজনকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। এই কঠোর কিন্তু বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত সকলকে দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে বলে মত দেন উপস্থিতরা।
সালিশের শেষ পর্যায়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। চাচা-ভাতিজা, ভাই-ভাই একে অপরের সাথে হাত মিলিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে অতীতের ভুলত্রুটি ভুলে যাওয়ার এবং ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। এমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং অনেকেই এই সমাধানকে “উদাহরণযোগ্য” হিসেবে অভিহিত করেন।
এ বিষয়ে স্থানীয়দের মতামত জানতে চাইলে অনেকেই বলেন, “যে বিষয়টি থানায় অভিযোগ দিয়েও সমাধান হয়নি, সেটি গ্রামের মানুষ মিলে এত সুন্দরভাবে মীমাংসা করেছে—এটা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।” তারা বিশেষভাবে মোঃ জামাল উদ্দিন আলীর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
একজন প্রবীণ গ্রামবাসী মোঃ সোহেল রানা বলেন, “জামাল উদ্দিন আলী শুধু একজন নেতা নন, তিনি একজন অভিভাবক। তিনি যে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি সামাল দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।”
সাবেক ছাত্রনেতা মোঃ লিটন পারভেজ বলেন, “এমন নেতা থাকলে গ্রামে কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন থাকে না। তিনি নিরপেক্ষভাবে বিচার করেছেন, কাউকে ছোট করেননি, বরং সবাইকে একসাথে এনেছেন।”
সালিশে উপস্থিত যুবসমাজের প্রতিনিধিরাও সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, এই ধরনের শান্তিপূর্ণ সমাধান সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং ভবিষ্যতে সংঘাত এড়াতে সহায়ক হয়।
তবে সালিশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে আসে। জানা যায়, সেচ প্রকল্পের পানির লাইনের পাইপ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কেটে দেওয়া হয়েছিল। চার অংশীদারের বক্তব্য অনুযায়ী, পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের ধরে মোঃ ঈমান আলীর চাচা মোঃ মোতালেব হোসেন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এ বিষয়ে সালিশে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আগামী ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পুনরায় একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ সিদ্ধান্তকে এলাকাবাসী একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শুধু আপোষ-মীমাংসা নয়, সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধান করা জরুরি—যা এই সালিশের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বড়াইগ্রামের এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, সামাজিক ঐক্য, নেতৃত্বের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে যেকোনো জটিল সমস্যারও শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে মোঃ জামাল উদ্দিন আলীর নেতৃত্বে এই সালিশ শুধু একটি বিরোধ মেটায়নি, বরং সমাজে সম্প্রীতি ও সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও এমন নেতৃত্ব ও ঐক্যের মাধ্যমে যেকোনো সমস্যা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে এবং বড়াইগ্রাম একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী অঞ্চলে পরিণত হবে।