
নাটোরে তরমুজের দাম ‘আগুন’ ইফতারের ফল এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে
মোঃ সুজন মাহমুদ, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি।
পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের অন্যতম জনপ্রিয় ফল তরমুজ। কিন্তু এ বছর নাটোর জেলা সদর বাজারে তরমুজের দাম এতটাই বেড়েছে যে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে এই ফল। প্রতি কেজি তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। ফলে বাজারে তরমুজের স্তূপ থাকলেও ক্রেতা নেই—এমন দৃশ্য দেখা গেছে নাটোর শহরের বিভিন্ন স্থানে।
রোববার (৮ ই মার্চ) বিকেলে নাটোর শহরের কানাইখালী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে সারি সারি করে বসানো হয়েছে তরমুজের দোকান। প্রতিটি দোকানেই বড় বড় তরমুজ গাদা করে সাজানো থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। বিক্রেতারা বসে থাকলেও অনেকক্ষণ ধরে কোনো ক্রেতা না আসায় তাদের মধ্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট।
স্থানীয় এক তরমুজ বিক্রেতা বলেন, “মামা, তরমুজের মাল পর্যাপ্ত আছে। কিন্তু ক্রেতা নেই। সারাদিন বসে থাকি, বিক্রি খুবই কম হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় মানুষ কিনতে চায় না।”
তিনি আরও জানান, পাইকারি বাজার থেকেই তরমুজ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচসহ অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বিক্রেতারাও খুব একটা কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না।
বাজারে তরমুজ কিনতে আসা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তরমুজ কেনা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাটোর শহরের এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ক্রেতা বলেন, “রমজান মাসে ইফতারে তরমুজ খাওয়া আমাদের পরিবারের একটি নিয়মিত অভ্যাস। কিন্তু এবার যে দাম শুনছি, তাতে কিনতে দ্বিধা হচ্ছে। ৭০-৮০ টাকা কেজি হলে একটি তরমুজ কিনতেই কয়েকশ টাকা লাগে, যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।”
আরেকজন ক্রেতা বলেন, “সবকিছুর দামই বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল—সবকিছুর দাম বেশি। তার ওপর ফলের দামও যদি এত বেশি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে চলবে?”
নাটোর শহরের দিনমজুর শ্রেণির একজন ব্যক্তি জানান, “আমরা তো তরমুজের দোকানের কাছেও যেতে পারি না। সংসারের খরচ চালাতেই কষ্ট হয়। ফল কিনে খাওয়া এখন বিলাসিতা হয়ে গেছে।”
বাজারে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে উচ্চবিত্ত কিছু মানুষ তরমুজ কিনছেন। তবে তাদের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। অধিকাংশ দোকানেই তরমুজ সাজানো থাকলেও ক্রেতা না থাকায় বিক্রেতারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন।
কানাইখালী এলাকায় আরেকজন তরমুজ বিক্রেতার কাছে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি বছর রমজান মাসে তরমুজের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার দাম বেশি হওয়ায় সেই চাহিদা দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাজারে সরবরাহ থাকলেও বিক্রি কম হওয়ায় অনেক বিক্রেতাই ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
নাটোরের বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন খরচ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তরমুজের দাম বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া মৌসুমের শুরুতে ফলের দাম তুলনামূলক বেশি থাকে, যা পরে ধীরে ধীরে কমে আসে।
নাটোর শহরের বাসিন্দা মোঃ আলেক উদ্দিন শেখ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হলে ফলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষ করে রমজান মাসে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ফলের চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে স্বাভাবিক মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
নাটোর শহরের অনেকেই আশা করছেন, মৌসুম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তরমুজের দাম কমবে এবং সাধারণ মানুষ আবারও স্বাভাবিকভাবে এই ফল কিনতে পারবে। অন্যথায় রমজানের ইফতারের টেবিলে জনপ্রিয় এই ফলটি অনেক পরিবারের জন্য অধরাই থেকে যাবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নাটোরের বাজারে তরমুজের স্তূপ থাকলেও ক্রেতা কম—এমন দৃশ্যই যেন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দাম বেশি হলে চাহিদা কমে যায়। আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি এখন ক্রেতা যেমন, তেমনি বিক্রেতারাও।