যৌবন থেকে বার্ধক্য—কোমর ব্যথা এখন নিত্যসঙ্গী
চিকিৎসক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
বর্তমান যুগে কোমর ব্যথা একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বয়সভেদে এর ধরন ও কারণ ভিন্ন হলেও সমস্যাটি প্রায় সবার জীবনেই কোনো না কোনো সময় এসে ধরা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, বিশ্বজুড়ে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ মানুষ জীবনের অন্তত একবার কোমর ব্যথায় আক্রান্ত হন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ সংখ্যা কম নয়।
যৌবন বয়সে কোমর ব্যথা
যৌবন বয়সে কোমর ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। শহুরে জীবনে দীর্ঘসময় অফিসে বসে থাকা, কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের সময় কুঁজো হয়ে বসা, হঠাৎ ভারী বস্তু তোলা কিংবা অনিয়মিত ব্যায়াম অনেক তরুণ-তরুণীর কোমরে অস্বস্তি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
অতিরিক্ত সময় বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকা,
হঠাৎ বাঁকা হয়ে কিছু তোলা,
ব্যায়ামের সময় ভুল ভঙ্গি,
অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি,
কিংবা খেলাধুলার সময় আঘাত পাওয়া—
এসব কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কোমর ব্যথার প্রবণতা বাড়ছে।
বৃদ্ধ বয়সে কোমর ব্যথা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড় ও জোড়ার ক্ষয় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ৫০ বছরের পর থেকে কোমর ব্যথা প্রায় নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
হাড় ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস): ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
বাত বা আর্থ্রাইটিস: জোড়ার প্রদাহের কারণে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হয়।
ডিস্ক স্লিপ: মেরুদণ্ডের কশেরুকার মধ্যকার ডিস্ক সরে গিয়ে স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি করে।
স্নায়ুর সমস্যা: কোমরের ব্যথা নিতম্ব বা পায়ে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটে।
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা: ডায়াবেটিস বা স্থূলতাও এ সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে।
কোমর ব্যথার লক্ষণ
কোমরে টান বা অস্বস্তি অনুভব করা।
নড়াচড়া করলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
ব্যথা কখনও নিতম্ব, উরু কিংবা পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া।
দীর্ঘসময় বসে থাকার পর দাঁড়ালে ব্যথা হওয়া।
গুরুতর ক্ষেত্রে পায়ে ঝিনঝিন বা অবশভাব দেখা দেওয়া।
প্রতিকার ও করণীয়
কোমর ব্যথা প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। চিকিৎসকরা কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন—
1. সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা – বসা, দাঁড়ানো ও হাঁটার সময় শরীর সোজা রাখা জরুরি।
2. নিয়মিত ব্যায়াম – হালকা হাঁটা, যোগব্যায়াম ও স্ট্রেচিং করলে কোমর শক্তিশালী থাকে।
3. গরম বা ঠান্ডা সেঁক – হঠাৎ ব্যথায় ঠান্ডা সেঁক, আর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় গরম সেঁক উপকারী।
4. ওষুধ ও চিকিৎসা – ডাক্তারের পরামর্শে ব্যথানাশক ওষুধ বা মাংসপেশি শিথিলকারী ব্যবহার করা যায়।
5. ফিজিওথেরাপি – দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।
6. সুষম খাদ্যাভ্যাস – দুধ, মাছ, ডিম, শাকসবজি, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।
7. অতিরিক্ত ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলা – এতে মেরুদণ্ডে চাপ কম পড়ে।
চিকিৎসকের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, কোমর ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক সময় সাধারণ ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মেরুদণ্ডের গুরুতর সমস্যার রূপ নিতে পারে। যদি কয়েক সপ্তাহের পরও ব্যথা না কমে, হাঁটতে সমস্যা হয় কিংবা পায়ে অবশভাব দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি।
সংক্ষেপে বলা যায়, যৌবনে ভুল ভঙ্গি ও অতিরিক্ত চাপের কারণে কোমর ব্যথা দেখা দেয়, আর বৃদ্ধ বয়সে হাড় ক্ষয়, বাত ও স্নায়ুর সমস্যার কারণে এ ব্যথা বাড়ে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে কোমর ব্যথা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।