ভাঙ্গুড়ায় পাটক্রয় কেন্দ্র দখল: সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য’!
ইজারার আড়ালে বাণিজ্য, যন্ত্রাংশ বিক্রির অভিযোগ—নীরব প্রশাসন, প্রশ্নের মুখে কর্তৃপক্ষ
নিজস্ব প্রতিবেদক, পাবনা :
পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের পাটক্রয় কেন্দ্রের প্রায় সাড়ে তিন একর সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে জমি দখল, অবৈধ নির্মাণ ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ বিক্রির মতো গুরুতর অনিয়ম চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙ্গুড়া পৌর এলাকার চৌবাড়িয়া গ্রামের প্রায় পুরো পাটক্রয় কেন্দ্র এলাকা জুড়ে পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অনেক দখলদার ঘরে তালা লাগিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন, যা ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।
ইতিহাসের সম্পদ এখন দখলের কবলে
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে চলনবিলাঞ্চলের কৃষকদের পাট সংরক্ষণ ও বিপণনের সুবিধার্থে চৌবাড়িয়া গ্রামে প্রায় সাড়ে তিন একর জমির ওপর “মদনলাল আগরওয়ালা ক্রয়কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতার পর এটি “ভাঙ্গুড়া পাটক্রয় কেন্দ্র” নামে পরিচিতি পায়। একসময় এখান থেকে কৃষকদের পাট সংগ্রহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে সরবরাহ করা হতো।
কিন্তু পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কেন্দ্রটির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগেই শুরু হয় দখল ও বাণিজ্যের খেলা।
প্রভাবশালীদের দখল-বাণিজ্য
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর এলাকা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এরপর প্রভাবশালীরা ধীরে ধীরে জমি দখল করে এবং প্লট আকারে বিক্রি শুরু করে। কয়েক দফা হাতবদল হয়েছে বলেও জানা গেছে।
জরিনা রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী সেখানে বসতি স্থাপনের কথা স্বীকার করলেও জমি অধিগ্রহণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি এড়িয়ে যান।
পাশ্ববর্তী উপজেলার এক কলেজ শিক্ষক মো. শামীম দাবি করেন, তিনি ২০১১ সাল থেকে ডিসি অফিসে ভাড়া দিয়ে আসছেন। তবে কোনো লিজের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
দখলকৃত জমিতে মিফতাহুল ফালাহ প্রিক্যাডেট মাদ্রাসার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গোলাম মোস্তফা প্রথমে জমি কেনার কথা বললেও পরে তা অস্বীকার করেন।
এছাড়া ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজও একই এলাকায় ভবন নির্মাণ করেছে। কর্তৃপক্ষ লিজ নেওয়ার দাবি করলেও প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. আব্দুল জলিলের অভিযোগ, পাটক্রয় কেন্দ্রের মূল্যবান যন্ত্রাংশ রাতের আঁধারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জমি প্লট করে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের চুক্তিভুক্ত ইজারাদার বিএম গোলজার হোসেন জানান, তিনি ২০২৩ সালে ২.১৯ একর জমি ইজারা নেন, যা ২০২৭ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা হয়েছে। তার দাবি, তিনি জমিতে খামার করেছেন এবং যন্ত্রাংশ বিক্রির সঙ্গে জড়িত নন। তবে অন্যদের কাছে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
চুক্তি অনুযায়ী ইজারাকৃত জমি অন্যের কাছে হস্তান্তর বা ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই—এ তথ্য জানানো হলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
ভাঙ্গুড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, জমিটি পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং আংশিক ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে ইজারার বাইরে অবৈধ দখল ও পাকা স্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মাকছিম জানান, মোট জমির মধ্যে ২.১৯ একর ইজারা দেওয়া হলেও বাকি জমি দখল হয়ে গেছে। দখলমুক্ত করতে জেলা প্রশাসনের সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি
দখলমুক্ত করে জমিটি পুনরায় কৃষকদের স্বার্থে ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের প্রশ্ন—
সরকারি সম্পত্তি দখল হয়ে যাচ্ছে, অথচ কর্তৃপক্ষ নীরব কেন?