নাটোরে ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন
মোঃ সুজন মাহমুদ ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
শীতের দাপটে স্থবির কর্মজীবন, দুর্ভোগে শিশু–বৃদ্ধ–শ্রমজীবী মানুষ।
ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নাটোরের জনজীবন। কয়েক দিন ধরে টানা শীতের দাপটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত শীতের প্রকোপ এতটাই তীব্র থাকে যে ঘর থেকে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। সূর্যের দেখা মিলছে না দিনের বেশির ভাগ সময়, আর দুপুরের পর সামান্য রোদ উঠলেও তাতে তাপের কোনো ছোঁয়া নেই। ফলে শীত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
সকালবেলায় ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকে চারপাশ। সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও কুয়াশার ঘনত্ব এত বেশি যে সামনের কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না। এতে করে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। মোটরসাইকেল আর রিকশাচালকদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বের হচ্ছেন কাজে, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে ঘরেই অবস্থান করছেন।
শীতের এই তীব্রতা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ ও শ্রমজীবী মানুষদের। পর্যাপ্ত গরম কাপড় না থাকায় রাতের বেলা হাড় কাঁপানো শীতে অসহায় হয়ে পড়ছেন ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষরা। শহর ও গ্রামের খোলা জায়গা, ফুটপাত কিংবা অস্থায়ী ঘরে বসবাসকারীদের জন্য এই শীত যেন এক নীরব দুর্যোগ।
নাটোর পৌরসভার অ্যাডভোকেট আলেক উদ্দিন শেখ বলেন,
> ‘কনকনে শীতে ঘর থেকে বের হওয়াই যাচ্ছে না। প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও গরম কাপড়ে শীত নিবারণ করা যাচ্ছে না। ঘন কুয়াশার কারণে মোটরসাইকেল নিয়ে কাজে বের হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শীতের কাপড় পরে বের হলেও সর্দি-কাশি লেগেই যাচ্ছে।’
একই চিত্র নাটোরের উপজেলা এলাকাগুলোতেও। বড়াইগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা মোঃ সুজন মাহমুদ বলেন,
> ‘এই শীতে কোনো কাজেই মন বসে না। তীব্র ঠান্ডায় বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরেই বসে থাকতে হচ্ছে। হিমেল বাতাসে ঠান্ডা আরও বেশি লাগে। পানি ব্যবহার করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।’
শীতের দাপটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। কাজ বন্ধ রাখলে তাদের সংসার চলে না। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা শীতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। নারী দিনমজুর মতিয়া বেগম বলেন,
> ‘শীত দেখে লাভ নাই। কাজ না করলে খাবার জুটবে না। সংসার চলবে না। আমরা গরিব মানুষ, শীত হোক বা গরম—কাজ করতেই হয়।’
শীতের কারণে কৃষিখাতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভোরের কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে মাঠে কাজ করতে দেরি হচ্ছে। অনেক কৃষক জানান, সকালের দিকে মাঠে নামা যাচ্ছে না। ফলে বীজতলা ও শাকসবজির ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে শীতপ্রবণ রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে দিন দিন।
নাটোর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন ডা. মোক্তাদির আরেফিন জানান,
> ‘বর্তমানে হাসপাতালে রোগীর চাপ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে প্রচণ্ড শীতে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া আছে।’
তিনি সবাইকে গরম কাপড় পরিধান, শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং ঠান্ডা পানি ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।
শীতজনিত দুর্ভোগ লাঘবে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন জানান,
> ‘শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড় হিসেবে কম্বল বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের অগ্রাধিকার দিয়ে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও সহায়তা বাড়ানো হবে।’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় কম্বল ও শীতবস্ত্রের পরিমাণ এখনও অপ্রতুল। অনেক ছিন্নমূল মানুষ এখনো সহায়তার বাইরে রয়ে গেছে। তারা দ্রুত আরও বেশি পরিমাণ শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন রাত ও সকালবেলায় শীতের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। কুয়াশা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে নাটোরসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতজনিত দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সব মিলিয়ে ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতে নাটোরের জনজীবন এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল। শীতের এই কঠিন সময়ে মানবিক সহায়তাই পারে অসহায় মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে।